নীল পাহাড়ের পথে রেলের স্বপ্ন, দুর্গাপুরে জাগছে উন্নয়নের নতুন ভোর

68


সৈয়দ সময়, নেত্রকোনা :

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কি এবার সত্যিই হতে চলেছে? নেত্রকোনার সীমান্তঘেঁষা দুর্গাপুর-কলমাকান্দা অঞ্চলের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ নিয়ে আবারও জোরালো আশার আলো দেখা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে আগামী ১৩ মে বুধবার সরেজমিন পরিদর্শনে আসছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। সফরকে কেন্দ্র করে পাহাড়-নদীঘেরা জনপদে এখন উৎসবমুখর প্রত্যাশার আবহ।

সরকারি সফরসূচি অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টায় ঢাকা থেকে সড়কপথে নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন ডেপুটি স্পিকার। তাঁর সঙ্গে থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি, সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

দুপুর ১২টায় প্রতিনিধি দলটি জারিয়া-ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করবেন। পরে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি ঘুরে দেখে বিকেল ৩টায় দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দুর্গাপুর ও বিরিশিরি বহুদিন ধরেই দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্বচ্ছ নীল জলের লেক, চীনামাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদীর স্রোতধারা আর গারো পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য পর্যটকদের টানে বারবার। তবে নাজুক সড়ক যোগাযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় ভ্রমণপিপাসুদের। রেললাইন চালু হলে ঢাকা থেকে সরাসরি নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

শুধু পর্যটন নয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিজয়পুরের মূল্যবান চীনামাটি, সোমেশ্বরী নদীর বালি-পাথর এবং পাহাড়ি কৃষিপণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কম খরচে পরিবহনের নতুন দুয়ার খুলে দেবে রেলপথ। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী তাকদির হোসাইন বলেন, “রেললাইন হলে ব্যবসার খরচ অনেক কমে যাবে। সড়কপথে মালামাল পরিবহনে ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, ট্রেন হলে সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।”

আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুসের ভাষায়, “জারিয়া থেকে অল্প কিছু দূর রেললাইন বাড়লেই দুর্গাপুর সরাসরি ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে ব্যবসা ও পর্যটন দুই খাতেই বিপুল পরিবর্তন আসবে।”

শিক্ষার্থীদের মাঝেও দেখা দিয়েছে নতুন স্বপ্ন। শিক্ষার্থী রাজশ্বেরী রায় আরাধ্য বলেন, “ময়মনসিংহে পড়াশোনার জন্য যাতায়াত সহজ হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের অনেক সুবিধা হবে। রেল চালু হলে উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ হবে।”

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হাজং সম্প্রদায়ের নেত্রী নন্দিতা হাজং মনে করেন, রেল যোগাযোগ সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, “কম খরচে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হলে আমাদের মানুষের কষ্ট অনেক কমে যাবে।”

গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন মুকুল বলেন, “দুর্গাপুরের কৃষিপণ্য, পাহাড়ি ফলমূল, চীনামাটি ও বালি পরিবহনে রেলপথ সবচেয়ে কার্যকর হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।” দুর্গাপুরবাসীর প্রত্যাশা।

এই সফর যেন শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বহু বছরের স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেলে রেললাইন হবে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সীমান্ত জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।

Leave a Reply