কণ‍্যা যতই রূপবতী গুনবতী হোক – বিবাহ দেয়ার জন্য সংযোগ, সম্বন্ধ বা ঘটক দরকার হয়

42

মোঃ জাহিদ হোসেন দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ

লিখতে জানলেই বই ছাপানো যায়না।
বই সম্পাদনা করার জন‍্য এডিটর আর মলাটবন্দী করার জন‍্য প্রকাশক জরুরি। আমি অতশত জানি না – অতি আবেগে বই লিখে ফেলেছি এখন দেখছি বিশাল হ‍্যাপা। কনে যেমন গায়ে হলদি, হাতে মেন্দি দিয়ে , ব্রাইডাল মেকাপের আস্তর মুখে লাগিয়ে, বেনারসী পরে বিয়ের স্টেজে বসে তেমনি বই এরও নাকি মেকাপ হয়, প্রচ্ছদ শিল্পী প্রচ্ছদ করেন , ফল‍্যাপ ডিজাইন তাহার পর ছাপানো আর বাইনডিং!

জানুয়ারি মাস – আমার জরুরি ভিত্তিতে একজন প্রকাশক ও এডিটর দরকার – সময় খুব কম!
বিশাল বড় অফিসটির রিসেপশনে বসে আছি বিশ মিনিট ধরে! জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি তারপরও টেনশনে আমার নাক ঘামছে ! অনেক কষ্টে সম্পাদকের সাথে দেখা করার এপয়নটমেনট পেয়েছি !! উনি বিখ্যাত মানুষ এবং মহা ব‍্যসত! সহজে কারও সাথে দেখা করেন না ! আমাকে দশ মিনিট সময় দিয়েছেন ! এর মধ্যে উনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব তো !? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ডাক পরলো !
মিটিং রুমে আমাকে বসানো হলো! আবার অপেক্ষা! পিয়ন সম্ভবত আমাকে চেনে! পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর নোনতা বিস্কুট নিয়ে এসে কান পর্যন্ত হাসি দিলো! ম‍্যাডাম, যাবার সময় একটা সেলফি তুলব – রিকোয়েস্ট! আমি মৃদু হেসে হুম বলার সাথে সাথেই সম্পাদক ভদ্রলোক ঢুকলেন! তাঁর নাম বহু শুনেছি, সৌম‍্য দর্শন প্রৌঢ়! বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি! চট করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে চা ছলকে শাড়িতে পরে গেল!
স‍্যার, আমি একটা বই লিখেছি, আপনার প্রকাশনার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাই!
এবছর আর কোন বই ছাপার সুযোগ নেই ! এটা জানুয়ারি মাস!
প্লিজ স‍্যার, একবার পান্ডুলিপিটা দেখুন! এডিট করা আছে! আমি জানি, আমার লেখা মন দিয়ে পড়লে সবার ভালো লাগবেই ! আমার এডিটরও এটা বিশ্বাস করেন!
উনি পান্ডুলিপি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলেন! অতি আশ্চর্যের বিষয় একপাতা পড়ার পর দ্বিতীয় পাতাও পড়লেন !
আপনি নিজে লিখেছেন?
জি স‍্যার !
তৃতীয় পাতাও পড়লেন ! আমি আশান্বিত হৃদয়ে দুরুদুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি!
আপনি ভালো লিখেন! কিন্ত আপনি তো জানেন বিভিন্ন কারণে আমরা সরকারের সুনজরে নেই ! এখন আপনার বই ছাপিয়ে আমরা নতুন করে সরকারের রোষানলে পরতে চাইনা! আপনি বুদ্ধিমতী! আশা করি, বুঝতে পারছেন !
প্রচন্ড কষ্ট পেলাম! জীবনে কখনো কাউকে সুপারিশ করি নাই ! এই প্রথম! মিথ্যা মামলার জন‍্য আমার লেখা ছাপানো যাবে না?
আমার ব‍্যথাতুর হতাশ মুখের দিকে চেয়ে বোধহয় উনার করুণা হলো!
তারপরও রেখে যান পান্ডুলিপি! আমাদের কমিটি আছে তারা দেখুক !
মনে মনে ভাবলাম, শত শত পান্ডুলিপির মাঝে অবহেলায় পরে থাকবে আমার লেখা ? এটা তো সাধারণ লেখা না ! এ আমার রক্তলিখন! চোখ ভরা পানি নিয়ে উঠে চলে আসি! পিয়নটা পিছন পিছন আসে !
ম্যাডাম সেলফি? আমি চোখের পানি মুছে নকল হাসি দিয়ে ছবি তুলি!
এরপর আমার মেডিকেল কলেজের এক আপার সাথে আরেক প্রকাশকের অফিসে যাই ! তার প্রকাশনা সংস্থাও অনেক নামকরা! সেখানে বিশাল লাইব্রেরি আছে! এত সুন্দর সাজানো! মুগ্ধ হয়ে যাই ! বই এর তাক, বই পড়ার সোফা, কোনে কোনে গাছ, আয়না , মূর্তি- সর্বত্র রুচির ছাপ সুস্পষ্ট!
সম্পাদকের রুমে নিয়ে গেলেন আপা!
ভদ্রলোকের বয়স বাষট্টি হবে! কালো, বেটেখাটো!
আপা পরিচয় করিয়ে দিলেন! ওর নাম মিষ্টি- আমার মেডিকেল কলেজের জুনিয়র! মিষ্টি আপনার প্রকাশনার মাধ্যমে একটা বই প্রকাশ করতে চায়!

ভদ্রলোকের চোখ আমার মুখ, ঠোঁট, গলা আর বুকে ঘোরাফেরা করতে লাগলো! ভীষণ অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেলাম!

লেখা তো সহজ জিনিস নয় ! চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলেন! চাইলেই লেখা যায়না! আমি শিখিয়ে দিব কিভাবে লিখতে হয় ! তিন যুগ ধরে বই প্রকাশ করছি! তুমি আসবা রেগুলার! আমি খুব ব‍্যসত তারপরও তোমার জন‍্য এক ঘন্টা করে সময় দিব!
প্লিজ, আমার পান্ডুলিপিটা পড়ুন ! এডিট করা! তাছাড়া এটা জানুয়ারি- লেখা শিখে লিখতে গেলে এবছর তো বই বের করতে পারবো না!
উনি পান্ডুলিপি ছুঁয়েও দেখলেন না!
আহা ! এত তাড়াহুড়ো কিসের? তুমি আসো, অনেক কিছু শিখতে পারবে! কুতকুতে চোখ টিপে বললেন, তোমার বই ছাপালে সরকার থেকে চাপ আসতে পারে কিন্তু তোমার মতো সুন্দরীর জন‍্য এতটুকু না হয় করলামই!
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! এত রুচিশীল একটা অফিসের মালিক এতটা অরুচিকর! ছি:!
ছাপাব না আমার বই !
পান্ডুলিপি ফেরত নিয়ে চলে আসি!
আরেকটি স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা যারা হুমায়ুন স‍্যারের অধিকাশ বই প্রকাশ করেছেন ( সংগত কারনেই নাম বলছি না। তারা পান্ডুলিপি পড়ে বই প্রকাশের বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী! বই ছাপানো মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল! কিন্তু শেষ মুহূরতে প্রকাশকের স্ত্রী ভেটো দিলেন ! উনার স্বামী আমার বই ছাপাতে এত উৎসুক কেন ? এটাই ঐ ভদ্রমহিলার দুশ্চিন্তার কারন ! তখন জানুয়ারির মাসের দশ দিন মাত্র বাকী আছে!

আশ্চর্যের বিষয় একটি সত্তর বছরের পুরানো প্রকাশনা সংস্থা আমার এডিটরের মাধ্যমে আমার সাথে যোগাযোগ করলেন! তারা সাগ্রহে আমার বইটি ছাপতে চান! মেলায় তারা চারটি স্টল পান! উনার ধারনা বইটি ভালো বিক্রি হবে!
উনার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিলো! বন্দিনী প্রথম খন্ড এক মাসে তিনটি মুদ্রণ শেষ হয়ে যায় !

Leave a Reply