সিন্ডিকেট ভাঙায় টার্গেট ডিজি: নেপথ্যে সংস্কার বনাম স্বার্থান্বেষী মহলের লড়াই

66


নিজস্ব প্রতিবেদক

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) দীর্ঘদিনের জগদ্দল পাথর হয়ে বসে থাকা দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মূলে আঘাত হানায় এখন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) মোঃ হাসান মারুফ। গত ৪ মার্চ ২০২৫ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে একের পর এক কঠোর ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ায় অধিদপ্তরের ভেতরের এবং বাইরের একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মূলত নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ, কেনাকাটায় ই-জিপি (e-GP) প্রবর্তন এবং দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট ভেঙে বদলি বাণিজ্য বন্ধ করার কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে একটি পক্ষ। যারা এখন ডিজিকে বিতর্কিত করতে বিভিন্ন ভিত্তিহীন ও মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে।

‘১৫৫ টাকায় নিয়োগ’: যে বিপ্লবে কাঁপছে দালাল চক্র
ডিএনসিতে একসময় নিয়োগ মানেই ছিল কোটি টাকার লেনদেন আর প্রভাবশালী মহলের তদবির। বর্তমান মহাপরিচালক সেই প্রথা ভেঙে ৩০৯ জন কর্মচারী নিয়োগে এক অভাবনীয় স্বচ্ছতা এনেছেন। মাত্র ১৫৫ টাকা ফি দিয়ে টেলিটকের মাধ্যমে আবেদন নিয়ে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়।
অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ফলে কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের। এরপর থেকেই মূলত ডিজিকে সরাতে বা বিতর্কিত করতে অপতৎপরতা শুরু হয়।

শতভাগ ই-জিপি ও টেন্ডার সিন্ডিকেট
অধিদপ্তরের কেনাকাটা ও টেন্ডারে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর। দায়িত্ব নেওয়ার পর মোঃ হাসান মারুফ সব ধরনের কেনাকাটা শতভাগ সরকারি e-GP সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসেন। এতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় কমিশনভোগী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ আয়ের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

রাজনৈতিক তকমা বনাম বাস্তবতা
একটি পক্ষ ডিজিকে বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। মোঃ হাসান মারুফ একটি বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। ১৯৭১ সালে তার বাবা মাহাতাবুর ইসলাম পাকবাহিনীর হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন এবং তার মামা শহীদ গোলাম নবী (সাটু) মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৭ বছরে তিনি কোনো প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট পদে ছিলেন না। বরং দীর্ঘ সময় ঢাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। কর্মকর্তাদের মতে, তিনি রাজনৈতিক তকমাধারী হলে বিগত সরকারের আমলে একাধিক লাভজনক ও নীতিনির্ধারণী পদে আসীন থাকতেন।

প্রশাসনিক শুদ্ধি ও জিরো টলারেন্স
অধিদপ্তরের শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি বছরের পর বছর একই স্টেশনে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি এবং মাদকবিরোধী অভিযানে অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছেন। এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে অসাধু কর্মকর্তারা।

স্বল্প সময়ে বড় উদ্যোগ
অধিদপ্তরকে আধুনিকায়ন করতে তিনি ডোপ টেস্ট বিধিমালা প্রণয়ন, বিভাগীয় শহরগুলোতে ১৪০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন, ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার এবং সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের কাজ শুরু করেছেন। মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রসিকিউটরদের প্রশিক্ষণ ও বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও তার হাত ধরে গতি পেয়েছে।

নেপথ্যের কারণ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘প্রিকারসর’ আমদানির অন্যায্য কোটা বৃদ্ধির দাবি প্রত্যাখ্যান এবং বিশেষ কোনো ব্যক্তির আত্মীয়কে অনৈতিক সুবিধা না দেওয়াই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মাদক দমনের মতো স্পর্শকাতর খাতে একজন সংস্কারমুখী কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করবে।

বিশেষজ্ঞ অভিমত: সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ব্যক্তি আক্রমণ করে সংস্কার বন্ধ করার এই অপচেষ্টা রুখে দেওয়া জরুরি। জনস্বার্থেই একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

Leave a Reply