
বিষেশ প্রতিনিধি গলাচিপা পটুয়াখালী :-
গোলখালী ইউনিয়নের চর হরিদেবপুর গ্রামটা যেন আজও থমথমে। বিকেলের শেষ আলো যখন নদীর জলে পড়ে সোনালি ঢেউ তোলে, তখন গ্রামের বয়স্ক মানুষগুলো নিঃশব্দে বসে থাকে—কারও চোখে জল, কারও মনে দীর্ঘশ্বাস। কারণ, এই গ্রাম শুধু একটি নাম হারায়নি, হারিয়েছে এক ছায়া, এক আশ্রয়—মরহুম এছাহাক আকন।
“এই রাস্তা দিয়ে কতবার গেছেন উনি…,” ধীর কণ্ঠে বললেন বৃদ্ধ রহিম উদ্দিন, “মানুষের খোঁজ নিতে, দুঃখ ভাগ করতে… এমন মানুষ আর হবে?”
এছাহাক আকন—এই নামটি ছিল একসময় ভরসার প্রতীক। দরিদ্র কৃষকের ঘরে চাল নেই? তিনি আছেন। কারও ছেলে অসুস্থ? তিনি পাশে। গ্রামের ঝগড়া-মারামারি? তার এক কথায় মিটে যেত। রাজনীতি তার কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি ছিল না—ছিল মানুষের সেবার একটি পথ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গোলখালী ইউনিয়ন শাখার সভাপতি হিসেবে তিনি যেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি বিআরডিপির চেয়ারম্যান হিসেবে বারবার নির্বাচিত হয়ে মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছেন উন্নয়নের মাধ্যমে। কিন্তু এসব পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন “মানুষ”—যে পরিচয় সবচেয়ে বড়।
একদিন হঠাৎ করেই সেই মানুষটি হারিয়ে গেলেন। মৃত্যু তাকে কেড়ে নিলো, কিন্তু তার রেখে যাওয়া শূন্যতা যেন আরও বড় হয়ে রইলো।
সেই শূন্যতার ভেতরেই শুরু হয় আরেকটি গল্প…
রাতের নিস্তব্ধতায় বসে আছেন মোসাঃ খাদিজা এছাহাক। ঘরের এক কোণে রাখা স্বামীর পুরনো চশমাটা হাতে নিয়ে তিনি যেন ফিরে যান অতীতে।
“তুমি তো বলেছিলে, আমি পারব…” নিজের মনেই ফিসফিস করে বলেন তিনি।
স্বামীকে হারানোর পর তার জীবন যেন থমকে গিয়েছিল। তিন সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামের সেই দিনগুলো ছিল নিঃশব্দ কান্নায় ভরা। বাইরে থেকে শক্ত থাকলেও, ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সময় কাউকে থামতে দেয় না।
হরিদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ বছর শিক্ষকতা করে তিনি শুধু শিক্ষিকা ছিলেন না—ছিলেন একজন পথপ্রদর্শক। শত শত শিক্ষার্থীর জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন তিনি। সমাজসেবার প্রতিটি কাজে তার অংশগ্রহণ ছিল নিঃস্বার্থ।
একদিন বিকেলে কয়েকজন গ্রামবাসী এলেন তার বাড়িতে।
“আপা, আমরা চাই আপনি চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন,” বললেন এক তরুণ।
খাদিজা একটু থমকে গেলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠলো স্বামীর মুখ।
“আমি পারব?”—একটু কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“আপনি তো এছাহাক আকনের স্ত্রী… আপনি পারবেন না, তাহলে কে পারবে?”—উত্তরে দৃঢ় কণ্ঠ।
সেই রাতটা আর ঘুমাতে পারেননি তিনি। জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবলেন—এই মানুষগুলো কি শুধু তাকে নয়, তার স্বামীর আদর্শকেই আবার ফিরে পেতে চাইছে?
পরদিন সকালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন।
“আমি রাজনীতি করতে চাই না,” তিনি বললেন, “আমি শুধু মানুষের পাশে থাকতে চাই… ঠিক যেমন তিনি ছিলেন।”
তার কণ্ঠে ছিল না কোনো উচ্চাভিলাষ, ছিল শুধু দায়বদ্ধতা।
গ্রামের মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করলো। তারা বিশ্বাস করতে লাগলো—এছাহাক আকন হারিয়ে যাননি, তিনি বেঁচে আছেন তার আদর্শে, তার পরিবারের মাঝে।
শেষ বিকেলে চর হরিদেবপুরের আকাশে আবার লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের পথ দিয়ে হেঁটে যান খাদিজা এছাহাক। মানুষ তাকে দেখে সালাম দেয়, হাসিমুখে এগিয়ে আসে।
কেউ বলে, “আপা, আপনি থাকলে আমরা ভরসা পাই।”
তিনি মৃদু হেসে বলেন, “আমি একা কিছুই না… আপনারাই আমার শক্তি।”
দূরে কোথাও যেন ভেসে আসে একটি পরিচিত কণ্ঠ—
“মানুষের পাশে থাকো…”
খাদিজা থেমে যান এক মুহূর্ত। চোখের কোণে জল আসে, কিন্তু সেই জলের ভেতরেও থাকে দৃঢ়তা।
কারণ, কিছু মানুষ চলে গেলেও—
তাদের পথ কখনো শেষ হয় না।
মরহুম এছাহাক আকন শুধু একটি নাম নন,
তিনি এক আদর্শ—যে আদর্শ বেঁচে থাকে মানুষের হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
বাড়ি নং-৬৬, সোনারগাঁ জনপথ রোড, সেক্টর -১১, উত্তরা ঢাকা-১২৩০
মোবাইল নং: ০১৯৮৫২৩১১১২
Copyright © 2026 টপ নিউজ প্রতিদিন | বাংলা নিউজ পেপার. All rights reserved.