নেত্রকোণা-৩ আসনে বিএনপির ভেতরে দ্বন্দ্বের রাজনীতি: তৃণমূল বনাম সংগঠন, দুলাল–হিলালীর মুখোমুখি লড়াই

27

সৈয়দ সময় , নেত্রকোনা :

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া–আটপাড়া) আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন স্পষ্ট দ্বিমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে। দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই মেরুকরণ শুধু নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় নয়, বরং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণকেও নতুনভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।


দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আলহাজ্ব মো. দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা অনেকটা প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও বিভাজনকে।


গত ৩ নভেম্বর বিএনপি দেশের ২৩৭টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করে। ওই তালিকায় নেত্রকোণা-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন পান জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ্ব ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। এতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়র দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন।


এই ঘোষণার পর থেকেই কেন্দুয়া ও আটপাড়ায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ পেতে থাকে। হাট-বাজার, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে দলীয় আড্ডা সবখানেই ঘুরপাক খেতে থাকে একটাই প্রশ্ন: দেলোয়ার দুলাল কি দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে নামবেন?


সেই জল্পনার অবসান ঘটে দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলালের ফেসবুক পোস্টে, যেখানে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুলাল ও হিলালী এই দুই নেতার শক্তির ভিত্তি একেবারেই ভিন্ন।


দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল পরিচিত তৃণমূলভিত্তিক জনপ্রিয় নেতা হিসেবে। সরাসরি ভোটে একাধিকবার নির্বাচিত হওয়া, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং দায়িত্ব পালনকালে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা। সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে শক্ত অবস্থানে রেখেছে।


অন্যদিকে ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী দলের সাংগঠনিক শক্তির প্রতীক। জেলা পর্যায়ে তাঁর প্রভাব, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থা এবং দলীয় কাঠামোর সুসংগঠিত সমর্থন তাঁকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে দৃঢ় অবস্থানে রেখেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানার বিষয়ে তাঁর কঠোর অবস্থানও ইতোমধ্যে স্পষ্ট।


দীর্ঘ সময় পর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশায় ভোটারদের আগ্রহ বেড়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের জন্য মাঠ অনেকটাই উন্মুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে তার সুবিধা নিতে পারে অন্য কোনো প্রার্থী বা জোট—এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।


তাঁদের মতে, দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শক্তভাবে মাঠে থাকেন, তবে এটি কেবল ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং বিএনপির অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করবে। আবার একই সঙ্গে এটি দলীয় প্রার্থীকে আরও সক্রিয় ও মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী প্রচারণায় নামতেও বাধ্য করতে পারে।
সব মিলিয়ে নেত্রকোণা-৩ আসনের নির্বাচন এখন আর শুধুই দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে জনপ্রিয়তা বনাম সংগঠনের শক্তির এক জটিল রাজনৈতিক লড়াইয়ে।

দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলালের স্বতন্ত্র প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে এই আসনের রাজনীতি আরও বহুমাত্রিক ও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক সমীকরণের চূড়ান্ত রায় দেবেন ভোটাররাই যার প্রতিফলন দেখা যাবে ব্যালট বাক্স খোলার দিন।

Leave a Reply