দুদকের মামলার পরও ধরা-ছোঁয়ার বাইরেদুর্নীতিবাজ বিআরটিএ কর্মকর্তা আলতাফের সম্পদের পাহাড়

মোঃ খাইরুজ্জামান সজিব বিশেষ প্রতিনিধি ঢাকা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ সরকারের রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা। এই সংস্থার নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতিবাজদের হাতে। দুর্নীতির টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারিরা গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। তবে দুর্নীতির অভিযোগে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বরং দুর্নীতিবাজরা পাচ্ছে নানান সুবিধা আছে বহাল তবিয়তে। তাদের অন্যতম হচ্ছে সিরাজগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আলতাফ হোসেন।

আলতাফ হোসেনের দুর্নীতির টাকায় অবৈধ সম্পদঃ আলতাফ হোসেনের দুলাভাই বিআরটিএর সাবেক সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আব্দুল জলিল ছিলেন একজন শীর্ষ ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। ২০০৬ সালে আব্দুল জলিল যখন মিরপুর কার্যালয়ের মোটরযান পরিদর্শক ছিলেন, তখন শ্যালক আলতাফ হোসেন জলিলের কাছ থেকে ঘুষ দুর্নীতির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহন করে। পরে ২০০৬ সালে মোটরযান পরিদর্শক পদে যোগ দেন আলতাফ। বছর সাতেক আগে পদোন্নতি পেয়ে এখন তিনি বিআরটিএর সিরাজগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক। চাকরি বাগানোর পর থেকেই টাকা কামাতে থাকেন কাঁড়ি কাঁড়ি। ঢাকায় আলতাফের দুটি বাড়ি ও একটি আড়াই কাঠা প্লট রয়েছে।পল্লবীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ‘কে’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর প্লটে বানিয়েছেন ছয়তলা বিলাসবহুল বাড়ি। কিনেছেন দামি গাড়ীও। পশ্চিম ভাসানটেকের শ্যামল পল্লী আবাসিক এলাকায় রয়েছে আলতাফের তিনতলা বাড়ি, আলতাফের বাড়ীর পাশে একই নকশায় আরেকটি বাড়ী আছে দুলাভাই জলিলের। এই দুইটি বাড়ি দেখভাল করেন আলতাফের মামা অটোরিকশাচালক আলহাজ। সূত্র বলছে, আলতাফের বাবা মোজাম্মেল হোসেন সরকার বাড়িটির মালিক। তবে পাবনার ফরিদপুরের সোনাহারা গ্রামে কৃষক মোজাম্মেলের পক্ষে ঢাকায় এত টাকায় বাড়ি বানানোর হিসাব কোনোভাবেই মেলে না। মিরপুরের জল্লাদখানা এলাকায় আলতাফের আড়াই কাঠার আরো একটি প্লট রয়েছে।

দুদকের সূত্র বলছে, সাড়ে তিন কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ ও পৌনে তিন কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বিআরটিএর এই সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন। সংস্থাটির উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রথম মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামি মো. আলতাব হোসেনের দুদকে দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ২৮৩ টাকার সম্পদ (স্থাবর ও অস্থাবর) গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করেছেন। অন্যদিকে, দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১ কোটি ১৪ লাখ ৭২ হাজার ৯৩ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী মোছা. জিয়াসমীন আরাকে প্রধান আসামি ও তার স্বামী আলতাব হোসেনকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। বিবরণে দেখা যায়, জিয়াসমীন তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৯ টাকার সম্পদের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য প্রদান করেছেন। আর দুদকের অনুসন্ধানে তার নামে ২ কোটি ৪২ লাখ ২ হাজার ২৫১ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গৃহিনী হিসেবে এত সম্পদ করা অসংগতিপূর্ণ। প্রকৃত অর্থে এসব সম্পদ তার স্বামী মো. আলতাব হোসেনের দুর্নীতির টাকায় গড়েছেন। সে কারণে তাকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে এ মামলায়। তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে আলতাফ হোসেনের ধারণা ‘ঘুষ খাইলে কী হয়, জেল হয়, ফাঁসি তো আর হয় না’। এমন দৃষ্টিভঙ্গির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীতে ছেয়ে গেছে পুরো সংস্থাটি। ফলে ক্ষতি হচ্ছে সরকার, ভুগছেন সেবাপ্রার্থীরা। তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই দুর্নীতিবাজদের। তারা দেদারছে চালিয়ে যাচ্ছেন অপকর্ম। এইসব দুর্নীতিবাজদের নিয়ে যন্ত্রণায় আছে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। তিনি দুর্নীতিবাজদের কব্জা থেকে বিআরটিএকে মুক্ত করতে যারপরনাই চেষ্টা করেছেন। তবে দুর্নীতিবাজদের লাগাম টানতে পারেননি। এরই মধ্যে আগামী ৩০ জুন বিধায় নিবেন এই চেয়ারম্যান। আসবে নতুন কেউ তবে বহাল থাকবে আলতাফরা এমনটাই বলছে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

আলতাফ হোসেন সাগরদাঁড়ি নিউজকে বলেন, আমি কোন অপরাধ না করেও শাস্তিমূলক বদলী হয়ে সিরাজগঞ্জ সার্কেলে আছি। কর্তৃপক্ষ আমাকে ভালো সার্কেলে বদলি দিচ্ছে না। তবে বড় দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে আমাদের মতো ছোট আয়ের ব্যক্তিদের পেছনে সময় নষ্ট করছে দুদক।

আলতাফ হোসেনের বক্তব্য থেকে বুঝা যায় বিআরটিএতে আরো বড় দুর্নীতিবাজ রয়েছে।

পরের পর্বে পড়ুন>>> বিআরটিএর সদর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সাধারণ) ডাঃ আসাদুজ্জামানের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

আলতাফের দুলাভাই আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধেও ছিল ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ, আলতাবের বোনের বিরুদ্ধেও আছে দুদকের দুই মামলা দুদক বলছে, জলিল ও তার স্ত্রী অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২ কোটি ৭৪ লাখ ৩০ হাজার ৩৩৯ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগ দখলে রেখে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮৪ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য দেন।

এছাড়া আসামি মো.আ. জলিল মিয়া সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পটুয়াখালী; কর্তৃক ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তার স্ত্রী মাহমুদা নাছরিনের নামে হস্তান্তর বা রূপান্তর বা স্থানান্তরের মাধ্যমে বৈধকরণের চেষ্টা ও সহযোগিতা করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪ (২) ও ৪(৩) ধারা এবং দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পাবনার সহকারী পরিচালক সাধন চন্দ্র সূত্র ধর উক্ত কার্যালয়

Leave a Reply